একটি নতুন স্মার্টফোন কেনার পর‌ও বেশি দিন পর্যন্ত খুশি থাকা যায় না কেন? জেনে নিন কারণ

একটি নতুন স্মার্টফোন কিনে সবাই খুশি হন। ক্স খোলার সঙ্গে সঙ্গে নতুন গন্ধ, উজ্জ্বল স্ক্রিন এবং সুন্দর লুক এক সঙ্গে একটি অনবদ্য অনুভূতি দেয়। তবে অনেক সময় এমনটা হয় না। কিছু মানুষ নতুন এবং দামী ফোন কিনেও খুশি থাকতে পারেন না। ফোন কেনার কিছু দিন পর‌ই মনে হয় যা ভেবে ফোনটি কেনা হয়েছিল তেমন এক্সপেরিয়েন্স পাওয়া যাচ্ছে না। ক্যামেরা আশানুরূপ ফল দিতে পারছে না, গেমিং আগের মতো স্মুথ নেই, ইউজার ইন্টারফেসে সমস্যা দেখা দেয় বা ফিচার শুধুমাত্র বিঞ্জাপন পর্যন্ত‌ই সীমিত। এবার প্রশ্ন ওঠে এত টাকা খরচ করার পর‌ও সন্তুষ্ট থাকা যায় না কেন।

প্রতি বছর নতুন Android এবং iPhone মডেল লঞ্চ হয়। কোম্পানিগুলি ইউজারদের মনে বিশ্বাস ঢুকিয়ে দেয়, যে তাদের কাছে যে ফোন রয়েছে সেটি পুরনো হয়ে গেছে এবং এখন আপগ্ৰেড করা প্রয়োজন। অথচ নতুন স্মার্টফোন কেনার কিছু দিন পর মনে হয় যত বড় আপগ্ৰেডের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল ততটাও পাওয়া যায়নি।

আকাশচুম্বী আশা, ব্যাবধান সামান্য

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে স্মার্টফোন লঞ্চ শুধুমাত্র একটি ফোনের লঞ্চ নয়, বরং একটি বড়সড় ইভেন্ট। ক্যামেরায় ‘যুগান্তকারী পরিবর্তন’, প্রসেসরে ‘গেম চেঞ্জার’, ডিজাইনের ক্ষেত্রে ‘এখন‌ও পর্যন্ত সবচেয়ে বড় রিডিজাইন’ প্রভৃতি শব্দ বারবার ব্যাবহার করা হয়। অথচ যখন ইউজাররা প্রতিনিয়ত ফোনটি ব্যাবহার করতে শুরু করেন তখন দেখা যায় পার্থক্য খুবই সামান্য।

মার্কেটিং আমাদের আশা অনেক বাড়িয়ে দেয় আর এটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা। আমরা মনে করি নতুন স্মার্টফোন কিনলে DSLR এর মতো রেজাল্ট পাওয়া যাবে, গেমিং কনসোলের মতো এক্সপেরিয়েন্স পাওয়া যাবে এবং আগের চেয়ে দ্বিগুণ গতিতে স্মার্টফোন কাজ করবে। তবে দৈনন্দিন ব্যাবহারের ক্ষেত্রে নজরকাড়া পার্থক্য ধরা পড়ে না।

স্পেসিফিকেশন দুর্দান্ত, তবে রেজাল্ট সাদামাটা

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে প্রায় প্রতিটি ফোনেই ’50MP’, ‘200MP’ বা ‘100X জুম’-এর মতো বিভিন্ন ভারি ভারি সংখ্যা দেখানো হয়। তবে ক্যামেরা শুধুমাত্র মেগাপিক্সেলের কারণে ভালো হয় না। অনেক সময় নতুন স্মার্টফোন নেওয়ার পর‌ও ইউজাররা মনে করেন আগের ফোনে বেশি ন্যাচারাল ছবি পাওয়া যেত।

কখনও কালার ওভার-প্রসেসড মনে হয়, কখনও স্কিন টোন অদ্ভুত দেখায় এবং কখনও লো-লাইটের কারণে আশানুরূপ ফল পাওয়া যায় না। যখন কোনো ইউজার দীর্ঘ দিন ধরে একটি নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের স্মার্টফোন ব্যাবহার করেন তখন তাঁর চোখ সেই ক্যামেরা টিউনিঙের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যায়। টেকনোলজির দিক থেকে নতুন ফোন যত‌ই ভালো হোক না কেন, আউটপুট আলাদা হলে আমাদের মস্তিষ্ক সেটিকে ‘খারাপ’ বলে মেনে নেয়।
ফোন নতুন, উপযোগিতা কম

অনেক ইউজার বিশেষভাবে গেমিঙের জন্য স্মার্টফোন কেনেন। কাগজে কলমে সুন্দর প্রসেসর, বেশি RAM এবং হাই রিফ্রেশ রেটযুক্ত স্ক্রিন যথেষ্ট ভালো লাগে। তবে অনেক সময় নতুন ফোনে পুরনো ফোনের মতো গেমিং এক্সপেরিয়েন্স পাওয়া যায় না। এর পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে। নতুন ফোন বেশি গরম হতে পারে, তাড়াতাড়ি থ্রটলিং শুরু হতে পারে বা অনেক সময় সফটওয়্যার সম্পূর্ণ অপ্টিমাইজ হয় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুরনো ফোনে গেমিং আপডেট ভালোভাবে টিউন হয়ে যায়, তবে নতুন ফোনের জন্য ডেভেলপারদের সময় লাগে।

এইসব কারণেই নতুন স্মার্টফোন কেনার পর‌ও BGMI বা Call of Duty খেলার সময় আশানুরূপ এক্সপেরিয়েন্স পাওয়া যায় না।

অভ্যাস পরিবর্তন সহজ নয়

ইউজার এক্সপেরিয়েন্স শুধুমাত্র ফিচারের ওপর নির্ভর করে না, বরং মানুষ অভ্যাসের দাস। যখন কোনো ইউজার কয়েক বছর ধরে One UI, MIUI বা OxygenOS এর মতো UI (ইউজার ইন্টারফেস) ব্যাবহার করেন তখন তাদের আঙুল সেই ইন্টারফেসে অভ্যস্ত হয়ে যায়।

যখন ইউজাররা নতুন স্মার্টফোন কেনেন এবং UI বদলে যায়, তখন সেগুলি ‘কঠিন’, ‘অপ্রয়োজনীয়’ বা ‘অস্বস্তিকর’ হয়ে ওঠে। অনেক সময় নতুন UI বেশি ক্লিন এবং ফাস্ট হয়, তবে যেহেতু এটি অপরিচিত মনে হয় তাই ইউজারদের এটি সহজে পছন্দ হয় না। এই কারণেই অনেক ইউজার মনে করেন নতুন ফোনের চেয়ে আগের ফোনটি বেশি ভালো ছিল।

শুধুমাত্র বিঞ্জাপনেই সীমিত ফিচার

প্রত্যেক বছর কোনো না কোনো নতুন ফিচারের হাইপ শুরু হয়। কখনও হাই রিফ্রেশ রেট, কখনও 100X জুম, কখনও AI ক্যামেরা, আবার কখনও স্যাটেলাইট কানেক্টিভিটির ট্রেন্ড দেখা যায়। লঞ্চের আগে মনে হয় এই ফিচার ইউজারদের জীবন সহজ সরল করে তুলবে, জীবন বদলে দেবে। তবে ব্যাবহারের পর দেখা যায় দৈনন্দিন জীবনে এইসব ফিচারের তেমন উপযোগিতা নেই। নিঃসন্দেহে 100X একটি উল্লেখযোগ্য ফিচার, তবে প্রতিদিন কতজন ইউজার এটি ব্যাবহার করেন? 120Hz ডিসপ্লে অবশ্যই ভালো, তবে এই স্ক্রিন কি যথাযথ 60Hz এর চেয়ে দ্বিগুণ এক্সপেরিয়েন্স দিতে পারে?

অনেক সময় নতুন ফিচার প্রথম জেনারেশনে সম্পূর্ণ পারফেক্ট‌ও হয় না। কোম্পানির পক্ষ থেকে সেই ফিচার তাড়াতাড়ি লঞ্চ করে দেওয়া হয় এবং পরবর্তী দুই-তিন মডেলে সংশোধন করা হয়। এর ফলে যারা সেই প্রথম জেনারেশনের স্মার্টফোন কেনেন তাঁরা আদতে এক ধরনের টেস্ট ইউজারে পরিণত হয়।

দাম এবং ভ্যালুর তফাৎ

যখন কোনো স্মার্টফোন 80,000 টাকা বা 1,00,000 টাকা দামে লঞ্চ করা হয়, তখন সেই স্মার্টফোন সম্পর্কে সেই অনুপাতে আশাও বেড়ে যায়। তবে আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন ফ্ল্যাগশিপ স্মার্টফোনে দাম অনুযায়ী ভ্যালু পাওয়া যায় না। বাস্তবে 40,000 থেকে 50,000 টাকা দামের ফোনেও যথেষ্ট ভালো পারফরমেন্স ও ব্যাটারি লাইফ পাওয়া যায়। অপরদিকে সাধারণ ইউজাররা ফ্ল্যাগশিপ এবং মিড-রেঞ্জ ফোনে তেমন পার্থক্য অনুভব করতে পারেন না। তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই দামী স্মার্টফোন কেনার পর ইউজারদের মনে হয় এত বেশি দামের ফোন কেনার প্রয়োজন ছিল না।

দ্রুত গতিতে পরিবর্তনশীল টেকনোলজি

প্রায়শই দেখা যায় নতুন কোনো স্মার্টফোন কেনার কিছু দিন পর‌ই সমস্ত কোম্পানি নতুন স্মার্টফোন বা বেশি অ্যাডভান্স টেকনোলজি পেশ করে। লঞ্চ ইভেন্ট, বড় বড় প্রতিশ্রুতি ও ‘এখন‌ও পর্যন্ত সবচেয়ে…’ এই ধরনের শব্দ প্রকাশ্যে আসে এবং এর ফলে কিছু দিন আগে কেনা ফোনটি পুরনো মনে হতে শুরু হয়। আদতে বাজারে ফোন নয়, বরং আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটে। কোম্পানিগুলি এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করে যে সাধারণ মানুষের মনে হয় দারুণ কিছু হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। ফলে নতুন স্মার্টফোন কেনার পর খুব বেশি দিন আশানুরূপ খুশি বজায় থাকে না। আসলে টেকনোলজিতে খামতি থাকে না, বরং ক্রমবর্ধমান আশা এবং তুলনা ইউজারদের খুশি কেড়ে নেয়।

মাত্র কয়েক মাসে আপগ্ৰেডেড ভার্সন

মোবাইল ইন্ডাস্ট্রির একটি জিনিস ইউজারদের যথেষ্ট জ্বালাতন করে, আপগ্ৰেডেড ভার্সন। আগে একটি ফোন কেনার প্রায় বছর খানেক পর সেই ফোনটির আপগ্ৰেডেড ভার্সন লঞ্চ হতো। তবে বর্তমানে চার থেকে ছয় মাসের মধ্যে নেক্সট জেনারেশন স্মার্টফোন লঞ্চ হয়ে যায়। এই কারণেও গ্ৰাহকদের খুশি বেশি দিন টেকে না।

নতুন ফোন কেনার পর প্রাইস কাট

খুশি হ্রাসের আরেকটি প্রধান কারণ হল দামের দ্রুত হ্রাস। নতুন স্মার্টফোন কেনার কয়েক মাসের মধ্যেই সেই ফোনের দামে দারুণ ডিসকাউন্ট অফার জারি করা হয়। এর ফলে ইউজারদের মনে হয় তাঁরা ঠকে গেছেন। যখন কোনো ইউজার একটি নতুন স্মার্টফোন লাখ টাকা দামে কেনেন তার কিছু দিন পর কোনো সেলে সেই ফোনটি অনেকটা কম দামে বিক্রি করা হয়। ফলে ইউজারদের মন খারাপ হ‌ওয়া স্বাভাবিক

পুরনো বা রিফার্বিশড ফোন কেনা কি ভালো?

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে দুই-তিন বছর পুরনো ফোনেও প্রায় নতুনের মতো ফিচার পাওয়া যায়। পার্থক্য থাকে শুধুমাত্র সেই ফোনের ‘নতুন’ তকমায়। এক্ষেত্রে রিফার্বিশড স্মার্টফোন বেশি ভালো অপশন হয়ে ওঠে। এই ধরনের ফোন লুক ও কাজের দিক থেকে প্রায় নতুনের মতোই হয়, তবে দাম অনেকটাই কম হয়। ফলে প্রায় অর্ধেক দামে এক‌ই ক্যামেরা, এক‌ই পারফরমেন্স এবং এক‌ই ইউজার এক্সপেরিয়েন্স উপভোগ করার সুযোগ থাকে।

আমরা কেন খুশি হ‌ই না?

নতুন স্মার্টফোন কেনার পর আমাদের খুশি না হ‌ওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো আমাদের আশা। কোম্পানিগুলির মার্কেটিং দেখে মনে হয় নতুন স্মার্টফোন কিনলে আমাদের জীবন বদলে যাবে। আদতে বর্তমানে স্মার্টফোন ইন্ডাস্ট্রির আপগ্ৰেড আমাদের ইউজার এক্সপেরিয়েন্সে তেমন পার্থক্য সৃষ্টি করতে পারে না। পরিবর্তন হচ্ছে ঠিকই, তবে তা প্রচন্ড ইনোভেটিভ কিছু নয়। আকাশচুম্বী আশার পর যখন বাস্তবে সামান্য তফাৎ ঘটে তখন নিরাশ হ‌ওয়া স্বাভাবিক।

আসলে নতুন স্মার্টফোন কেনা ভুল নয়, না বুঝে শুনে শুধুমাত্র ‘নতুন ফোন’-এর আশায় একটি নতুন স্মার্টফোন কিনলে কখনোই খুশি হ‌ওয়া সম্ভব নয়। ইউজারদের নিজেদের প্রয়োজন বুঝে, মার্কেটিঙের ফাঁদে পা দেওয়ার বদলে বাস্তব উপযোগিতার কথা ভেবে ও তাঁর সত্যি নতুন স্মার্টফোন কেনা উচিৎ কি না নির্ণয় করা দরকার। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুরনো ফোন নতুন ফোনের চেয়ে বেশি উপযোগী হয়, শুধু মেনে নেওয়ার অপেক্ষা।

LEAVE A REPLY
Please enter your comment!
Please enter your name here