হঠাৎ করে কেন ফোনের ক্যামেরা ও মেমরি কমানোর পর 5G ফোনের দামে 4G স্মার্টফোন বেচা হচ্ছে?

2018-19 সালে দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোনে দুই বা তিন নয়, বরং চারটি ও পাঁচটি করে ক্যামেরা যোগ করা হত এবং তখন ফোনের ক্যামেরার মেগাপিক্সেল বলে মানুষের রীতিমতো গর্ব হত। এরপর 2020 সালের পর থেকে মোবাইল জগতে মেমরি ও RAM ওয়ার শুরু হয়ে যায়। বাজার থেকে 4GB RAM ভ্যানিশ হতে থাকে এবং 6GB ও 8GB RAM সহ স্মার্টফোন ক্রমশ সাধারণ হয়ে ওঠে। 2024-25 সাল আসতে আসতে 12 হাজার টাকার বাজেটে 8GB RAM ফোন লঞ্চ হতে শুরু করে এবং বড় ফোনে 16GB RAM ব্যাবহার করা হয়। অপরদিকে বেসিক 4G ফোনের দামে 5G স্মার্টফোন পেশ করা হতে থাকে।

তবে বর্তমানে পরিস্থিতি আবার বদলাতে শুরু করেছে এবং জিনিসপত্রের দাম আবার বাড়তে শুরু করেছে। দামী ফোনেও কোম্পানি ডুয়েল ক্যামেরা সেট‌আপ যোগ করা শুরু করেছে, 6GB RAM এর প্রাইসে আবারও 4GB এবং 128GB মেমরির বদলে 64GB স্টোরেজ সহ স্মার্টফোন লঞ্চ হতে শুরু করেছে। যে প্রাইস রেঞ্জে 5G ফোন পাওয়া যেত আবার সেই দামে 4G স্মার্টফোন পেশ করা হচ্ছে। এসব দেখে প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক, এমন কি হল যে টেক জগতের আমূল পরিবর্তন ঘটে গেল? এই পোস্টে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করা হল।

প্রধান কারণ AI

গোটা বিশ্বে AI অর্থাৎ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সম্পর্কে শোরগোল পড়ে গিয়েছে। প্রত্যেকেই ধীরে ধীরে AI এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। আপাতত স্মার্টফোনে উপলব্ধ বেশিরভাগ AI সার্ভিস বিনামূল্যে ব্যাবহার করা গেলেও, অধিকাংশ সাধারণ মানুষ জানেন না এই AI সার্ভিসের কারণেই আজকের দিনে দাঁড়িয়ে স্মার্টফোনের দাম উর্ধ্বগামী।

গোটা বিশ্ব AI এর প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং এর জন্য বড় বড় ডেটা সেন্টার তৈরি করা হচ্ছে। এইসব ডেটা সেন্টারের জন্য প্রচুর পরিমাণে মেমরি আবশ্যক হয়, এক্ষেত্রে RAM এর প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। অপরদিকে AI ডেটা সেন্টারের জন্য স্টোরেজ মেমরির চাহিদাও এতটাই বেড়ে গেছে যে কোম্পানিগুলির জন্য সেই যোগান পূরণ করা মুশকিল হয়ে পড়ছে। AI এর জন্য মেমরি চিপের এই অপরিসীম চাহিদাই আজ মেমরি চিপের দাম আকাশ ছুঁয়েছে। এই বিষয়ে একজন অনেক বছর ধরে ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে জড়িত ব্যাক্তি জানিয়েছেন, এই প্রথম ফোনের মেমরির এই বিপুল চাহিদা দেখা গেল। আগে যে মেমরি চিপ 6 বা 7 ডলারে পাওয়া যেত, এখন সেগুলির দাম 27 থেকে 30 ডলার হয়ে গেছে। এর থেকেই বোঝা যাচ্ছে দাম কি পরিমাণে বেড়েছে।

অপর এক ইন্ডাস্ট্রি এক্সপার্টের মতে আগে যখন ফোনের জন্য মেমরি চিপ অর্ডার দেওয়া হত, তখন দাম আগে থেকেই নির্ধারিত হত। অথচ এখন পরিস্থিতি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, মেমরি চিপের অর্ডার নিয়ে নেওয়া হয়, তবে কবে দেওয়া হবে এবং কি দামে দেওয়া হবে সেই বিষয়ে কিছুই জানানো হয় না। দাম কোন রেঞ্জে হতে পারে শুধুমাত্র সেই আভাসটুকু আগে দেওয়া হয়, তবু ডেলিভারির সময় দেখা যায় দাম যথেষ্ট বেশি। এই কারণেই ফোনের দাম দিন দিন বেড়ে চলেছে। এক‌ই কারণে আগে যে দামে বেশি RAM ও স্টোরেজ পাওয়া যেত, এখন তুলনামূলক কম RAM ও মেমরি নিয়ে সন্তুষ্ট হতে হচ্ছে।

কম ক্যামেরার রহস্য

মোবাইল ফোনের ক্যামেরা শুরু থেকেই অন্যতম আলোচিত এবং জনপ্রিয় একটি ফিচার। তবে 2010-11 সালের পর থেকে এই সেগমেন্টে বুম দেখা যায়। ফোনে হাই রেজোলিউশন ক্যামেরা ব্যাবহার হতে থাকে। পিকচার ডিটেইলিং বাড়তে থাকে এবং নাইট ফটোগ্রাফি রেজাল্ট‌ও ক্রমশ সুন্দর হতে শুরু করে। তবুও সাধারণ মানুষের চাহিদার শেষ নেই! ফলে স্মার্টফোনে দুই বা ততোধিক ক্যামেরা সেন্সর দেওয়া হয়। প্রথমে LG Optimus 3D এবং এরপর HTC EVO 3D ডুয়েল রেয়ার ক্যামেরা সেট‌আপ সহ বাজারে আসে। এরপর ফোনে ক্যামেরা সংখ্যা ক্রমেই বাড়তে থাকে এবং প্রথম স্যামসাং চারটি ক্যামেরা সহ Galaxy A9 স্মার্টফোন লঞ্চ করেছিল। এরপর বাজারে চারটি ক্যামেরা সহ ফোনের হিড়িক পড়ে যায়। ফোনের চারটি ক্যামেরা আলাদা আলাদা ফিচারের জন্য ব্যাবহার করা হত।

ফোনের মেইন ক্যামেরা সাধারণ ফটোগ্রাফি করে এবং দ্বিতীয় লেন্স ওয়াইড অ্যাঙ্গেল হিসাবে ব্যাবহৃত হয়। এছাড়া তৃতীয় লেন্স ডেপ্থ এফেক্টের জন্য এবং চতুর্থ লেন্স ম্যাক্রো অর্থাৎ অত্যন্ত কাছ থেকে ছবি তুলতে সক্ষম। এইসব ফিচার ক্যামেরার উপযোগিতা আরও বাড়িয়ে তুলতে শুরু করে এবং ইউজাররা ফোনের ক্যামেরায় তোলা ছবিকে DSLR এর সঙ্গে তুলনা করতে থাকে।

তবে এর কয়েক বছর পর বা বলা ভালো বর্তমানে ক্যামেরার সংখ্যা আবারও কমতে শুরু করেছে। এর পেছনে মূত দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমত কোম্পানিগুলি কস্ট কাটিং করতে চায় এবং দ্বিতীয়ত আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ফোনের হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার এতটা সক্ষম হয় গেছে যে ইন-বিল্ট হার্ডওয়্যার‌ই ক্যামেরার কিছু ফিচার সামলাতে সক্ষম। বর্তমানে অধিকাংশ ফোন থেকে ম্যাক্রো লেন্স সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং কিছু ফোনের সফটওয়্যারের মাধ্যমে মেইন ক্যামেরাই ম্যাক্রো শট ক্যাপচার করতে পারে। আবার কিছু ফোনে ওয়াইড অ্যাঙ্গেল এবং কিছু ফোনে ডেপ্থ সেন্সর বাদ দিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ডুয়েল রেয়ার ক্যামেরা সেট‌আপ যোগ করা হচ্ছে। এর ফলে কোম্পানির যেমন উৎপাদন ব্যয় কমছে, আবার ফিচার সম্পর্কে ইউজারদের কোনো অভিযোগ‌ও থাকছে না। এইসব কারণেই ধীরে ধীরে ফোনের ক্যামেরা সংখ্যা কমতে শুরু করেছে।

5G এর জায়গায় 4G স্মার্টফোন

খেয়াল করলে দেখা যাবে গত বছর পর্যন্ত 9 হাজার টাকার ওপরের সমস্ত স্মার্টফোনে 5G ফিচার পাওয়া যেত। অথচ এই বছর 12 হাজার টাকা বাজেটেও 4G স্মার্টফোন লঞ্চ করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ কিছু দিন আগে এবার প্রশ্ন ওঠে এর কারণ কি? লঞ্চ হ‌ওয়া Realme P4 Lite ফোনটির কথা বলা যেতে পারে। প্রথমেই জানিয়ে রাখি শুধুমাত্র বড় ফোনের নয়, বরং ছোট ফোনের ক্ষেত্রেও মেমরি কস্ট বেড়েছে। বড় ফোনের দাম কিছুটা বাড়িয়ে সেটি তাও বাজারে আনা যায়, তবে ছোট ফোনের ক্ষেত্রে এভাবে দাম বাড়ানো যায় না। এই কারণে বিভিন্ন কোম্পানি ফোনের ফিচারের সঙ্গে আপস করতে শুরু করেছে। আর তাই 5G এর দামে 4G স্মার্টফোন লঞ্চ করা হচ্ছে।

উপরোক্ত এইসব কারণেই বর্তমানে ফোনে কম RAM, কম স্টোরেজ এবং 5G এর বদলে 4G কানেক্টিভিটি পাওয়া যাচ্ছে।

LEAVE A REPLY
Please enter your comment!
Please enter your name here